ইয়াজিদ একটি জল্লাদ বাহিনী মদীনা আক্রমণ করার জন্য পাঠাল এবং নির্দেশ দিল, প্রথমে ওদেরকে বুঝাও, বুঝে আসলেতাে ভালাে, অন্যথায় তাদেরকে কঠোরভাবে দমন কর। নির্দেশমত ইয়াজিদের জল্লাদ বাহিনী মদীনা শরীফ আক্রমণ করল। মদীনা শরীফের নওজোয়ানরা ওদেরকে প্রতিরােধ করার জন্য এগিয়ে আসলেন। কিন্তু ইতিপূর্বে জল্লাদ বাহিনীর আগমণের খবর পেয়ে অনেক লােক এদিক ওদিক সরে গিয়েছিল। তাই সবাইকে একত্রিত করার সুযােগ পেলেন । তবুও ওনারা বীর বিক্রমে ইয়াজিদের জল্লাদ-বাহিনীকে রুখে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ মুষ্ঠিমেয় যুবক ইয়াজিদের দুর্ধর্ষ জল্লাদ বাহিনীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। এ যুবকগণ শহীদ হওয়ার পর ইয়াজিদ বাহিনী শহরে প্রবেশ করে পবিত্র মদীনা শরীফে এমন জঘন্য কান্ড-কীর্তন করেছিল, যা কল্পনা করলেও লােম শিউরে ওঠে। তারা দশ হাজার লােককে হত্যা করেছিল, মসজিদে নব্বীতে ঘােড়া বেঁধেছিল মােটকথা হুযুর (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) এর ইজ্জতের প্রতি আদৌ ভ্রুক্ষেপ করেনি। বাচ্চাদের হত্যাকরে বর্শার অগ্রভাগে নিয়ে ঘুরিয়েছিল। মদীনা শরীফে অবস্থানরত পবিত্র মহিলাদের ইজ্জত হরণ করেছিল।
বিশিষ্ট তাবেঈ হযরত সায়েদ বিন মসীয়ব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, মদীনা শরীফের কোন লােককে ওরা জীবিত ছাড়েনি। রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে লাশ আর লাশ পড়ে ছিল। এমন কোন ঘর দেখা যায়নি, যে ঘর লুন্ঠিত হয়নি। হযরত সায়েদ (রাঃ) আরও বলেন, আমি পাগলের ছদ্মবেশ ধারণ করে মসজিদে নব্বীতে প্রবেশ করেছিলাম। যখন ওরা চারিদিকে রক্তপাত করে মসজিদে নববীতে ঘােড়া বাঁধতে আসলাে, আমাকে দেখে বলল, একেও ধর এবং মার। তখন.আমি পাগলের মত আচরণ করতে লাগলাম।, তা দেখে এদের সরদার বললাে, ওকে ছেড়ে দাও, এ পাগল মনে হয়, হয়তাে মসজিদে থাকে। অতঃপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে ওরা চলে গেল। তিনি আরও বলেন, তিন দিন পর্যন্ত মসজিদে নব্বীতে কোন আযান, ইকামত ও কোন জামাত হয়নি। কিন্তু যখন আযানের সময় হতাে, তখন যথারীতি আযানের শব্দ শােনা যেতাে। আমি আশ্চর্য হয়ে যেতাম। কোন লােকজন নেই, এ আযানের ধ্বনি কোথেকে আসে। শেষ পর্যন্ত আযানের ধ্বনির রেশ ধরে অগ্রসর হয়ে দেখলাম স্বয়ং রওজা পাক থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসছে। এ ভাবে আমি তিন দিন সেই আযানের ধ্বনি শুনে পনের ওয়াক্ত নামায আদায় করি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত রওজা পাক থেকে আযান, ইকামত ও জামাতের আওয়াজ আসতাে।
তিন দিন পর ইয়াজিদ বাহিনী যখন মদীনা-মনােয়ারা থেকে চলে গেল, তখন চারিদিক থেকে লােক ফিরে আসেন এবং এসে লাশ সমূহ দাফন করেন। এরপর তারা পুনরায় মদীনা-মনােয়ারাতে বসবাস করতে লাগলেন। ইয়াজিদী বাহিনী মদীনা শরীফে যা করেছে এর পরিণাম সম্পর্কে আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহে ওয়াআলিহি ওয়াসাল্লাম) কি বলেছেন, তা শুনুন- “যে মদীনাবাসীকে অত্যাচার করে, ভয় দেখায়, আল্লাহু তাআলা ওকে ভীতু করবেন। ওর প্রতি আল্লাহ, ফেরেস্তাগণ ও সমস্ত মানুষগণের লানত। এ বার অনুমান করুন, যারা মদীনাবাসীকে ভয় দেখায়, ওদের প্রতি আল্লাহর লানত পতিত হয়, কিন্তু যারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদের কি পরিণতি হবে?
ইয়াজিদী বাহিনী মদীনা শরীফে ধ্বংসযজ্ঞ চালােনাের পর মক্কা শরীফের দিকে ধাবিত হল। সেই সময় মক্কার সমস্ত লােকেরা হযরত আবদুল্লাহ বিন জোবাইয়ের (রাঃ) এর সাথে ছিল। তা ছাড়া সে সময় অনেক সাহাবীও সেখানে ছিলেন। তারা সবাই ইয়াজিদী বাহিনীকে প্রতিরােধ করার জন্য পুর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কারণ ইতিপূর্বে তাদের কাছে মদীনা শরীফের খবর পৌঁছে ছিল। যখন ইয়াজিদী বাহিনী মক্কা গিয়ে আক্রমণ করল, হযরত আবদুল্লাহ বিন জোবাইর তাঁর সমর্থকদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন চালালেন। ফলে, ইয়াজিদী বাহিনী সেখানে কৃতকার্য হতে পারল । তবে, মক্কা শরীফকে ঘিরে ফেলল। সে সময় হযরত আবদুল্লাহ বিন জোবাইর তাঁর সকল সমর্থকসহ হেরেম শরীফের অভ্যন্তরে ছিলেন। ইয়াজিদী বাহিনী দূর থেকে পাথর নিক্ষেপণ হাতিয়ার দ্বারা এমনভাবে পাথর নিক্ষেপ করেছিল যে, পবিত্র কাবা শরীফের আঙ্গিনা পাথরে ভরে গিয়েছিল। মানুষ যেখানে তওয়াফ করতে সেখানেও পাথরের স্তুপ পড়ে গিয়েছিল।
যে সব পাথর খুব জোরে এসে দেয়ালের সাথে লেগেছিল, এর থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়ে কাবা শরীফের গিলাফ জ্বলে গিয়েছিল। তখন বায়তুল্লাহ শরীফের ছাদ কাঠের ছিল, সেখানেও আগুন লেগে যায়। সেই ছাদের উপর সেই দুম্বার শিং তাবরুক হিসেবে হিফাজত করে রাখা হয়েছিল, যেটা হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর কুরবানীর পরিবর্তে বেহেস্ত থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল, সেটাও জ্বলে গিয়েছিল।
পূর্ববর্তী পেইজ | পরবর্তী পেইজ |
(৩৪) ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবানল | (৩৬) ইয়াজিদের উপর খােদার লানত |
সূচীপত্র | এরকম আরো পেইজ |