মজলুম কাফেলার সকলেই যখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন তখন কাফেলার একমাত্র জীবিত পুরুষ সদস্য হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ) শোকে পাথর হয়ে এক কিনারে দাঁড়িয়েছিলেন। সবাই যখন উনাকে ঘরে যাওয়ার জন্য জোর করলেন, তিনি বললেন, আমার আব্বাজান ওছীয়ত করেছেন, মদীনা শরীফ পৌঁছে যেন সবার আগে তাঁর নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরীফে হাজিরা দিই। তাই আমি রওজা পাকে যাওয়ার আগে কোথাও যাব না। অতঃপর তিনি রওজা শরীফে গিয়ে পৌঁছলেন। হযরত যাইনুল আবিদীন (রাঃ) যিনি এতক্ষণ পর্যন্ত ছবর ও ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিশ্চুপ ছিলেন, তিনি রওজা পাকের সামনে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শুধু এতটুকু বলতে পারছিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর সালাম গ্রহণ করুন। এরপর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবং অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের দেখা কারবালার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলেন। আর তাঁর কান্নার সাথে সাথে মদীনা শরীফের সমস্ত দেয়াল থেকে কান্নার রোল বের হচ্ছিল এবং রওজা মুবারকও থরথর করে কাঁপছিল এবং সেখান থেকে আওয়াজ বের হলো, যাইনুল আবিদীন! তুমি আমাকে কী শুনাচ্ছ? আমি তো সব কিছু স্বচক্ষে দেখেছি। মদীনাবাসী হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ) উনাকে ধৈর্য ধারণের কথা বললেন, আল্লাহ তায়ালা’র যা হুকুম ছিল, তা হয়েছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিতা আহলিয়া উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, মদীনা শরীফে একবার সেই দিন ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেই দিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালা’র সান্নিধ্যে গমন করেছিলেন। আর একদিন ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হলো, যেদিন হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ) কারবালা থেকে ফিরে এসেছেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা আরো বর্ণনা করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিছাল শরীফের দিন অদৃশ্য থেকে যেভাবে ক্রন্দনের আওয়াজ শুনা গিয়েছিল, হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর শাহাদাতের সময় একইভাবে অদৃশ্য থেকে কান্নার আওয়াজ শুনা গিয়েছিল।
রওজা শরীফে হাজিরা দিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ) ঘরে গেলেন এবং একান্ত ছবর ও ধৈর্য সহকারে মদীনা শরীফে অবস্থান করতে লাগলেন। হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন (রাঃ)-এর এমন অবস্থা হয়েছিল যে, যখন তিনি পানি দেখতেন সীমাহীন কান্নাকাটি করতেন এবং বলতেন, এই সেই পানি, যা আলী আছগরের ভাগ্যে জোটেনি, হযরত আলী আকবরের ভাগ্যে জোটেনি, আহলে বাইত-এর সদস্যদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। উনার সামনে যখন খাবার আনা হতো তিনি দু’ এক লোকমা মুখে দিয়ে অবশিষ্টগুলো সামনে থেকে নিয়ে যেতে বলতেন। সবসময় একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। সাধারণ লোকদের সাথে মেলামেশা করতেন না এবং যতদিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, কোনদিন হাসেননি। উনার ছেলে হযরত ইমাম মুহম্মদ বাকির আলাইহিস সালাম একদিন উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আব্বাজান! কী ব্যাপার? আমি আপনাকে কোনদিন হাসতে দেখিনি। তিনি বললেন, বৎস! আমার চোখের সামনে কারবালার যে দৃশ্য ফুটে রয়েছে, তা দেখলে তোমার মুখ থেকেও চিরদিনের জন্য হাসি বন্ধ হয়ে যেত! তুমিও সারা জীবনে কোনদিন হাসতে না। বৎস! আমি পুতঃপবিত্র শরীর মুবারককে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি, প্রিয় নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নকশা মুবারককে দাফন-কাফনবিহীন অবস্থায় কারবালার প্রান্তরে পড়ে থাকতে দেখেছি। আমি নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় দৌহিত্রকে আঘাতে জর্জরিত হয়ে কারবালার তপ্ত বালি-রাশির উপর দাফন-কাফনবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। উলামায়ে কিরামগণ লিখেছেন, এই পৃথিবীতে পাঁচজন ব্যক্তি খুব বেশি কান্নাকাটি করেছেন। তাঁরা হলেন-
পূর্ববর্তী পেইজ | পরবর্তী পেইজ |
(৩২) শহীদ পরিবারের মদীনা শরীফ প্রত্যাবর্তন | (৩৪) ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দাবানল |
সূচীপত্র | এরকম আরো পেইজ |